🪔 শ্রী শ্রী সত্যনারায়ণ ব্রত 🪔


ব্রতের নিয়ম

এই ব্রতে কোনও তিথি-নক্ষত্রের নিষেধ নেই। যে কোনও ব্যক্তি প্রদোষকালে এই ব্রত করতে পারে। নারী-পুরুষ, কুমার-কুমারী সকলেই এই ব্রত করতে পারে। পূর্ণিমা বা সংক্রান্তি এই ব্রতের বিশেষ দিন। উপবাস থেকে এই ব্রত পালন করতে হয়।


ব্রতের উপকরণ

ঘট, আম্রপল্লব, ডাব বা কলা, সিন্দুর, গঙ্গামাটি, ধান, পিঁড়ি, পান, কলা, সন্দেশ বা বাতাসা, ফুল, তুলসী, দূর্বা, বেলপাতা, ধূপ, দীপ, নৈবেদ্য, ফল, দধি, মধু, ঘৃত, সিন্নির উপকরণ প্রভৃতি।


ব্রতের ফল

যে কোনও বয়সের নর-নারী এই ব্রত করতে পারে। এই ব্রত করলে সংসারের দুঃখ দূর হয় এবং ভগবান নারায়ণ মনের সকল কামনা পূর্ণ করেন।


ব্রতকথা

প্রথমে বন্দিনু আমি দেব গজানন।
সর্ব সিদ্ধিদাতা আর বিঘ্ন বিনাশন।
হর-গৌরী বন্দিনু বিরিঞ্চি নারায়ণ।
বশিষ্ঠ বাল্মীকি আদি বন্দি মুনিগণ।
প্রণমিনু সত্যপীর নিয়ত হাসিন।
যাহার কৃপায় হয় ভুবন অখিল।
লক্ষ্মী সরস্বতী বন্দি কালী করালিনী।
সত্যপীর উপাখ্যান অপূর্ব কাহিনী।।
শুন শুন সর্বজন হয়ে এক চিত।
যার যে পাইবে বর মনে বাঞ্ছিত।।
গরীব ব্রাহ্মণ এক ছিল মথুরায়।
ভিক্ষা করি কাটে কাল সুখ নাহি পায়।।
একদিন সেই দ্বিজ ভ্রমিয়া নগর।
কিছু না পাইয়া ভিক্ষা হইল কাতর।
বৃক্ষতলে এসে বিপ্র বিষাদিত মনে
কান্দিতে লাগিল দ্বিজ ভিক্ষার কারণে।
কান্দিতে কান্দিতে দ্বিজ হইল অস্থির।
দেখিয়া দয়ার্দ্র বড় হৈল সত্যপীর।।
দয়াময় প্রভুদেব সত্যনারায়ণ।
ফকিরের বেশে তারে দিল দরশন।
দ্বিজে কয় নারায়ণ, শুন মহাশয়।
কি কারণে কাঁদে তুমি বসিয়া হেথায়।।
দ্বিজ বলে, কি হইবে বলিলে তােমায়।
ফকির বলেন দ্বিজ ক্ষতি কিবা তায়।।
দ্বিজ বলে নিত্য আমি ভিক্ষা মাগি খাই।
আজ না পাই ভিক্ষা দুঃখ ভাবি তাই।
ফকির কহিল, দ্বিজ যাও নিজ ঘরে।
আমারে পূজা তব দুঃখ যাবে দূরে।।
দ্বিজ বলে, নিত্য পৃজি শিলা নারায়ণ।
তাহা ভিন্ন না করিব স্নেচ্ছ আচরণ।।
হাসিয়া ফকির বলে, শুন দ্বিজবর।
পুরাণ কোরাণে কিছু নাহি মতান্তর।।
রাম ও রহিমে জেনাে নাহি ভেদাভেদ।
ত্রিজগতে এই দুই জানিবে অভেদ।।
এত বলি নিজমূ্তি ধরে জগন্নাথ।
শখ চক্র গদা পদ্মধারী চারি হাত।।
মুক্তিহেরি দ্বিজবর পড়িল ধরণী।
করিল প্রচুর স্তব গদগদ বাণী।।
দেখিতে দেখিতে পুনঃ ফকির হইল।
দেখি তাহা দ্বিজবর বিস্মিত হইল।
ব্রাহ্মণ বলেন, প্রভু পূজিব তােমায়।
পূজার পদ্ধতি কিবা বল হে আমায়।
ফকির বলিল, তবে শুন দ্বিজবর।
ছড়া কলা করিবে আয়ােজন।
সওয়া গণ্ডা গুবাক আর পন সওয়া পান।।
সওয়া সেরা চিনি কিংবা গুড় আর ক্ষীর।
তাহাতে সস্তুষ্ট হই আমি সত্যপীর।।
চিনি আর ক্ষীর দিতে যার নাই শক্তি।
দুগ্ধ আর গুড় দিয়ে করিবে ভক্তি।
বসিবে সকল ভক্ত হয়ে একমন।
এক মনে ভক্তিভরে করিবে পূজন৷
পূজা অন্তে ব্রতকথা শুনিবে শ্রবণে।
ভক্তিতে পূজা কর শাস্ত্রের বিধানের
সত্যপীর বলি সবে মাথে দিবে হাত।
নারায়ণ বলিয়া করিবে প্রণিপাত।
প্রসাদ লইবে সবে শাস্ত্রের বিধান।
এত বলি নারায়ণ হন অন্তর্ধান
ভক্তিভাবে দ্বিজবর হয়ে হরষিত।
কিছু ভিক্ষা করি গৃহে হন উপনীত।
ব্রাহ্মণী শুনিয়া সব হয়ে আনন্দিত।
পূজা হেতু আয়ােজন করে বিধিমত।
ভক্তিভাবে পূজা দ্বিজ নারায়ণ পদ।
প্রভুর কৃপায় দ্বিজ লভিল সম্পদ৷৷
কাঠুরিয়াগণ সবে বিস্ময় মানিল।
ভক্তিভরে ব্রাহ্মণের জিজ্ঞাসা করিল ৷৷
ব্রাহ্মণ তাদের বলে বিধান সমস্ত।
কাঠুরিয়া পুজিবারে হৈল বড় ব্যস্ত।
সিন্নি যে করিল তারা বিধি সহকারে।
দুঃখ দূর হইল আনন্দ ঘরে ঘরে।
অতঃপর সদানন্দ সাধু একজন।
কাঠুরের সম্পদ দেখিয়া হৃষ্টমন।
জিজ্ঞাসিয়া সবকথা জানিতে পারিল।
শুনিয়া সাধুর মনে ভক্তি উপজিল।।
সাধু বলে অপ্রতুল নাহি অন্যধনে।
কন্যা নাই দুঃখ তাই সদা উঠে মনে।
যদ্যপি আমার এক জনমে তনয়া।
সত্যদেব পূজা করি আনন্দিত হৈয়া।
এত বলি গেল সাধু অঙ্গীকার করি।
যথাকালে জন্মে কন্যা পরমাসুন্দরী।
সত্যনারায়ণ পূজা সে সাধু ভুলিল।
যথাকালে কন্যাটির বিবাহ যে দিল।
অতঃপর সাজাইল সপ্তমধুকর।
জামাতা সহিত সাধু চলিল সত্বর।
দক্ষিণ পাটনা রাজা নাম কলানিধি।
সেই রাজ্যে সদাগরে মিলাইল বিধি৷৷
রাজা সম্ভাষিয়া তাকে তরণী চাপিয়া।
প্রমাদ ঘটিল তার সিন্নি নাহি দিয়া।।
রাজার ভাণ্ডার মাঝে ধনাদি যা ছিল।
রাত্রিতে আসিয়া সাধুর তরী পূর্ণ হল৷৷
ছল পেয়ে রাজা তার তরী লুঠ করে।
শ্বশুর জামাতা লয়ে রাখে কারাগারে
রাজাদেশে কোটাল মশানে লয়ে যায়।
পাত্র অনুরােধে তারা উভে প্রাণ পায়৷৷
কারাগারে বন্দী থাকে শ্বশুর জামাই।
কি কহিব উভয়ের দুঃখের সীমা নাই।
এখানে সাধুর পত্নী আর তার সুতা।
পতির বিলম্ব দেখি মহা শােকযুক্তা।।
সঙ্গতি বিনষ্ট হৈল পড়িল দুঃখেতে।
দাসীত্ব করিয়া খায় পরের গাহতে৷
একদিন সাধুকন্যা বেড়াইতে গিয়া।
আনন্দিত দ্বিজ-গুহে সিন্নি দেখিয়া।।
সব শুনি কন্যা সেথা মানত করিল।
পিতা আর পতি-আশে কামনা করিল।।
শ্বশুর জামাতা যেথা বন্দী কারাগারে।
নারায়ণ স্বপ্নে কন সেই নৃপবরে৷৷
শুন ওহে মহারাজ আমার বচন।
কলিকালে পূজী আমি সত্যনারায়ণ৷
সদাগর দুইজন শ্বশুর জামাই।
বিনাদোষে বন্দী আছে তােমারে জানাই৷৷
প্রভাত হইলে তুমি দুই সদাগরে।
দশগুণ ধন দিয়া তুষিবে আদরে।।
এত বলি ধরিলেন আপন মূরতি।
স্বপ্ন দেখি চমকিয়া উঠিল নৃপতি।
মুক্ত করি সদাগরে বহুধন দিল।
তরী পূর্ণ করি রাজা বিদায় করিল।।
বুঝিতে সাধুর মন সত্যনারায়ণ।
ফকিরের বেশে পথে দিল দরশন।।
ফকির বলেন, শুন ওহে সদাগর।
ফকিরেরে কিছু ভিক্ষা দিয়া যাও ঘর৷৷
শুনি সদাগর তারে অবজ্ঞা করিল।
তরীর সামগ্রী যত তুষাঙ্গর হৈল।
দেখি তাহা সদাগর করে হায় হায়।
ধরণী লােটায়ে ধরে ফকিরের পায়।
অবশেষে ফকির তাহারে কৃপা কৈল।
ধনৈশ্বর্যে তরী পুনঃ পরিপূর্ণ হৈল।।
উতরিল ঘাটে সাধু হৈল কোলাহল।
নাধুর রমণী কন্যা শুনি কুতুহল।।
তরীর সামগ্রী যত ভাণ্ডারেতে লৈয়া।
সিন্নি করিল সাধু আনন্দিত হৈয়া।।
সকলে প্রসাদ নল যােড় করি পাণি।
প্রসাদ ভূমিতে ফেলে সাধুর নন্দিনী।।
তাহা দেখি সত্যদেব কৃপিত হইল।
জামাতা সহিত তরী জলেতে ডুবাল।৷
হাহাকার করে সরবে পড়িয়া ভূমেতে।
শুনি সাধু কন্যা যায় ডুবিয়া মরিতে।
হেনকালে দৈববাণী হৈল আচম্বিত ।
সিরনি ফেলিয়া কন্যা কৈল বিপরীত।।
শুনি কন্যা সেই সিন্নি চার্টিয়া খাইল।
জামাতা সহিত তরী ভাসিয়া উঠিল
তরীর সকল দ্রব্য ভাণ্ডারেতে আনি।
করিলেক সওয়া সের সোনার সিরনী।
স্বপ্নে কহিলেন দেব, শুন সাধু তুমি।
সোনা হতে আটায়, সন্তোষ হই আমি।
স্বপ্ন দেখি সদাগর পরম হরিষে।
আটার সিন্নী করি পূজে সবিশেষে।।
ক্রমেতে প্রচার হল সবার আলয়।
ভক্তিভরে পূজিলেই আশা পূর্ণ হয়।
একমনে শুনে কিংবা পূজে নারায়ণ।
সর্বদুঃখ দূরে যায় শাস্ত্রের বচন।।
সিন্নি মেনে যেই জন হয় দুই মনা।
কদ্যপি না হয় সিদ্ধ তাহার কামনা।


🙏 ভক্তিভরে প্রণাম করহ সত্যনারায়ণের চরণে 🙏