×

ভগবত গীতা

অধ্যায় অনুসারে সাজানো • ভাষা — বাংলা

ওম নমো ভগবতে বাসুদেবায়। জয় শ্রীকৃষ্ণ। রাধে রাধে।

মানব জীবনের গভীরতম প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, যুগে যুগে নানা ধর্মগ্রন্থ, দার্শনিক তত্ত্ব, ঋষি-মুনি ও মহাপুরুষেরা মানুষকে আলোর পথে পরিচালিত করেছেন। কিন্তু কিছু শিক্ষা আছে যা সময়ের সীমা অতিক্রম করেও আজও তেমনি প্রাসঙ্গিক, জীবন্ত ও অনন্ত সত্য হিসেবে বিরাজমান। শ্রীমদ্ ভগবত গীতা সেই মহাগ্রন্থ, যেখানে জীবনের উদ্দেশ্য, কর্তব্য, ধর্ম, জ্ঞান, ভক্তি ও যোগ—সব কিছুর এক চমৎকার সমন্বয় ঘটেছে।

হাজার হাজার বছর আগে, কুরুক্ষেত্রের বিশাল যুদ্ধক্ষেত্রে শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের মধ্যে যে অমর সংলাপ হয়েছিল, তাই আজ আমাদের কাছে "গীতা" নামে পরিচিত। কিন্তু এটি কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের কাহিনী নয়—এ এক অন্তরের যুদ্ধের প্রতীক।

অধ্যায় ১-২: অর্জুনের বিষাদ ও সাংখ্যযোগ

কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে দুই সেনা—কৌরব ও পাণ্ডব—মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। কিন্তু এ যুদ্ধ কেবল রাজ্য বা সিংহাসনের জন্য নয়, এটি ধর্ম ও অধর্মের সংঘর্ষ, ন্যায় ও অন্যায়ের চূড়ান্ত সংঘাত। যখন যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে, তখনই অর্জুন তার প্রিয়জন, আত্মীয়স্বজন, গুরুজনদের বিপরীত শিবিরে দেখে। তার হৃদয় কেঁপে ওঠে, ধনুক হাত থেকে প্রায় পড়ে যায়, শরীর শীতল হয়ে আসে।

শ্রীকৃষ্ণ ধীরে ধীরে অর্জুনকে বোঝাতে শুরু করেন। কৃষ্ণ জানিয়ে দেন—দেহ নশ্বর, কিন্তু আত্মা অমর। যে দেহের মৃত্যুকে আমরা এত ভয় পাই, সেটি কেবল এক বাহন, এক সাময়িক আবরণ। আত্মা জন্ম নেয় না, মরে না—সে চিরন্তন, অবিনশ্বর ও অপরিবর্তনীয়।

কৃষ্ণ বলেন—মানুষের ধর্ম হচ্ছে নিজের কর্তব্য পালন করা। ফলের চিন্তা না করে, আসক্তি ত্যাগ করে কাজ করা উচিত। এটাই কর্মযোগের মূল শিক্ষা—"কাজ করতেই হবে, কারণ কর্ম ছাড়া জীবন চলে না।"

দ্বিতীয় অধ্যায়ে কৃষ্ণ যে জ্ঞান দেন, তা গীতার অন্যতম মূল শিক্ষা। তিনি বলেন—সেই মানুষই যোগী, যে সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি, জয়-পরাজয়—সবকিছুকে সমভাবে দেখে। স্থিতপ্রজ্ঞ সেই ব্যক্তি, যার মন বাইরের পরিবর্তনে নড়ে না, অন্তরে থাকে শান্ত ও স্থির।

অধ্যায় ৩: কর্মযোগ

কৃষ্ণ বলেন—"জগতে কেউ কর্মহীন থাকতে পারে না।" প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস, প্রতিটি চিন্তা, প্রতিটি পদক্ষেপই এক একটি কর্ম। কিন্তু মানুষকে বন্ধনে জড়ায় আসক্তি—ফলের প্রতি আকাঙ্ক্ষা। যদি কেউ কাজ করে ঈশ্বরকে উদ্দেশ্য করে, ফলের প্রতি লোভ ত্যাগ করে, তবে সেই কর্মই মুক্তির পথ হয়ে ওঠে।

কৃষ্ণ উদাহরণ দেন—যেমন সূর্য, বাতাস, নদী তাদের কাজ অবিরাম করে চলে, বিনিময়ে কিছুই প্রত্যাশা করে না। তেমনি মানুষকেও নির্লিপ্তভাবে, নিঃস্বার্থভাবে নিজের কর্তব্য পালন করতে হবে।

কৃষ্ণ উত্তর দেন—"জ্ঞান ছাড়া কর্ম অসম্পূর্ণ, আর কর্ম ছাড়া জ্ঞান নিষ্ক্রিয়। দুটো একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। কর্ম থেকে পালানো মুক্তি নয়; কর্মকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করাই মুক্তি।"

অধ্যায় ৪: জ্ঞানযোগ ও ঈশ্বরের অবতারত্ব

এই অধ্যায়ে কৃষ্ণ নিজেকে প্রকাশ করেন তাঁর দিব্য রূপে। তিনি বলেন—"যখনই পৃথিবীতে ধর্মের অবনতি ঘটে এবং অধর্ম বৃদ্ধি পায়, তখন আমি অবতীর্ণ হই—সাধুদের রক্ষা, দুষ্টদের বিনাশ এবং ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য।"

এই বাণী শুনে অর্জুন ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করে—এই কৃষ্ণ কেবল বন্ধু বা রথচালক নন, তিনি স্বয়ং ঈশ্বর। কৃষ্ণ বোঝান—যারা সত্যকে জানে, তারা বোঝে কর্মফল কীভাবে জ্ঞানের আগুনে ভস্ম হয়ে যায়।

অধ্যায় ৫: সংন্যাস ও কর্মযোগের সমন্বয়

এই অধ্যায়ে কৃষ্ণ বলেন—"শুধু কাজ ত্যাগ করলে মুক্তি আসে না। প্রকৃত ত্যাগ হলো আসক্তি ত্যাগ।" যে ব্যক্তি সংসারে থেকেও মনে ভাবে—"আমি নই কর্তা, ঈশ্বরই কর্তা"—সে-ই সত্যিকারের যোগী।

সংন্যাস মানে পৃথিবী ছেড়ে পালানো নয়; সংন্যাস মানে নিজের মনকে শুদ্ধ করে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে কাজ করা। যে সংসারে থেকেও নিজের মনকে ঈশ্বরচিন্তায় স্থির রাখতে পারে, সে-ই মুক্ত মানুষ।

অধ্যায় ৬: ধ্যানযোগ ও যোগীর শ্রেষ্ঠত্ব

এখানে কৃষ্ণ যোগের চূড়ান্ত রূপ ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন—"যে ব্যক্তি ভক্তি ও একাগ্রতার সঙ্গে ঈশ্বরকে মনে করে, মনকে সংযত করে, ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণে রাখে, সে-ই যোগীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।" ধ্যানই যোগের প্রাণ।

কৃষ্ণ আরও বলেন—মন অতি চঞ্চল, কিন্তু অনুশীলন ও বিরাগের মাধ্যমে তাকে শান্ত করা যায়। যে যোগী নিঃস্বার্থভাবে সকলের মঙ্গল চায়, যে ঈশ্বরকে ভালোবাসে এবং সকল জীবকে ঈশ্বরের প্রতিফলন হিসেবে দেখে—সে-ই প্রকৃত যোগী।

অধ্যায় ৭: জ্ঞান ও ভক্তির সমন্বয়

কৃষ্ণ বলেন—"আমার জ্ঞান অসীম, আমার শক্তি সর্বত্র বিরাজমান। পৃথিবীর যা কিছু আছে—মাটি, জল, আগুন, বায়ু, আকাশ, মন, বুদ্ধি ও অহংকার—সবই আমারই প্রকাশ।" তিনি জানান, এই জগতের প্রতিটি বস্তু তাঁর শক্তির অংশমাত্র।

যে মানুষ সত্য জানতে চায়, সে ভক্তির পথেই এগিয়ে যায়, কারণ ভক্তিই হলো ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানোর সহজতম উপায়। কৃষ্ণ বলেন, "যারা অন্য দেবতাকে ভজে, তাদেরাও আসলে আমাকেই ভজে—যদিও তারা তা জানে না।"

অধ্যায় ৮: মৃত্যু ও আত্মার যাত্রা

এই অধ্যায়ে কৃষ্ণ ব্যাখ্যা করেন মৃত্যু ও আত্মার প্রকৃত রহস্য। তিনি বলেন—"যে মানুষ মৃত্যুর সময় ঈশ্বরকে স্মরণ করে, সে ঈশ্বরের ধামে পৌঁছে যায়।" জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই তাই ঈশ্বরস্মরণ প্রয়োজন।

কৃষ্ণ বলেন—জন্ম ও মৃত্যু এক চক্রের মতো, যা অবিরত ঘুরে চলে। কিন্তু যে ভক্ত ঈশ্বরের স্মরণে থাকে, সে এই চক্র অতিক্রম করে চিরমুক্ত হয়।

অধ্যায় ৯: রাজবিদ্যা বা সর্বোচ্চ জ্ঞান

এখানে কৃষ্ণ জানান—ভক্তিই সেই সহজ পথ যা দিয়ে মানুষ তাঁকে লাভ করতে পারে। ভক্তি সরল, নিঃস্বার্থ, অহংকারহীন। কৃষ্ণ বলেন—"যদি কেউ আমাকে একটি ফুল, একটি পাতা, জল বা ফলও ভক্তিভরে দেয়, আমি তা আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করি।"

এই বাণীর অর্থ গভীর—ঈশ্বরের কাছে কোনো বস্তু বড় বা ছোট নয়; আসল মূল্য ভক্তির হৃদয়ে। তিনি বলেন, "যে আমার কাছে আসে, আমি তাকে গ্রহণ করি। সে পাপী হোক বা পূণ্যবান—ভক্ত হলে সকলেই মুক্তি পায়।"

অধ্যায় ১০: ঈশ্বরের ঐশ্বর্য

এই অধ্যায়ে কৃষ্ণ তাঁর ঐশ্বর্য প্রকাশ করেন। তিনি বলেন—"জগতে যা কিছু শ্রেষ্ঠ, মহৎ ও সুন্দর, সবই আমার প্রকাশ।" পর্বতের মধ্যে তিনি হিমালয়, নদীর মধ্যে গঙ্গা, অস্ত্রের মধ্যে বজ্র, ঋষিদের মধ্যে নারদ, যোদ্ধাদের মধ্যে অর্জুন—সবই তাঁরই প্রতিফলন।

যে ভক্ত তাঁকে এইভাবে দেখে, তার মনে সর্বদা তাঁর স্মরণ থাকে